প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ২৮ জুন ২০১৫

লালমাই ময়নামতি গ্রুপ অব মনুমেন্ট

 

যে কোন দেশ ও জাতির গৌরবময় পরিচয় চোখের সামনে বাস্তব করে তোলে কালের সাক্ষী হয়ে নীরবে জেগে থাকা প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ব ও প্রত্নস্থাপনা। বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে হলে এখন শুরু করতে হয় খৃষ্টপূর্ব ৫ থেকে ৬ শতক  আর ইতিহাস পরিবর্তনে যে সকল প্রত্নস্থান কলের সাক্ষী হয়ে দাড়িঁয়ে আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি প্রত্নস্থান।

আর এই গৌরবময় জনপদটির নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে লালমাই পাহাড়, শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, চন্ডি মন্দিরসহ ৫৪টি টিবি ও বৌদ্ধ বিহার।

১৯৮৯ সালের এপ্রিলে, ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে লালমাই পাহাড়ে কয়েকদফা প্রত্নতাত্তিক অনুসন্ধান চালানো হয়। এই অনুসন্ধানে,এখানে ১১টি প্রাগৈতিহাসিক প্রতœক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে লালমাই-১, লালমাই-২, লিলা মুড়া ও টক্কা মুড়া,মহরম আলীর বাড়ী, টিপরা মুড়া, আাঁদার মুড়া, মাইদার মুড়া, মেম্বোরের খিল, মেহের কুরের মুড়া, টক্কা মুড়া-২ ও সরদারের পাহাড়ে এই প্রতœক্ষেত্র প্রাপ্ত প্রতœবস্তুগুলি কাঠের ফসিল। এগুলো হচ্ছে কাটারি(৩টি), হাত কুঠার(৬টি), মাংস কাটার ভারি ছুরি(৪টি), কাঠ চাঁছার যন্ত্র(১২টি), বাটালি ১টি, ছুরি ২টি, ছুরির ফলা (৪৬টি), চাঁছলি(৯৮টি), সূচ্যগ্র যন্ত্র(৫০টি), ছিদ্র করার যন্ত্র(৯টি), খোদাই করার যন্ত্র(৪টি), ব্যবহৃত পাতলা কাঠের টুকরা(১২৪টি),কাঠের পাতলা টুকরো(৩৩টি), পাতলা ফালি(৪৩টি) এবং ২০০৪ সালের এক অনুসন্ধানে ১৭১ টি প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির হাতিয়ার পাওয়া গেছে। যা ঢাকা-ময়নামতি জাদুঘর ও কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিজস্ব সংগ্রহে রয়েছে। লালমাই পাহাড়ে এতগুলো হাতিয়ার প্রাপ্তি দেখে ধারণা করা যায় যে, প্রাগৈতিহাসিক সময়ে এই অঞ্চলে হাতিয়ার তৈরির কারখানা ছিল। আর তা যদি সত্যিই হয়ে থাকে ,তাহলে এই দেশের ইতিহাস লেখতে হবে আরো ৩,৫০০ বছর পূর্বে থেকে।

শালবন মহাবিহারঃ- প্রাচীন কালে এই বিহারটি ‘শালবন রাজার বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। তাই এর স্থানীয় নাম শালবন মহাবিহার। হাজার বছরের ইতিহাস জড়িত এই অঞ্চলকে ঘিরেই। খ্রিষ্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে দেববংশের রাজারা এই অঞ্চল শাসন করতো। আর এই বংশেরই চতুর্থ রাজা ভবদেব এই বিহারটি নির্মান করেন। বলে এর আরেক নাম ভবদেব মহাবির্হা । অসাধারন নির্মাণ শৈলী এবং অভূতপূর্ব পরিকল্পনায় গড়া শালবন মহাবিহারের প্রতিটি কুঠুরি ও দেয়াল। এই বিহারে ১১৫টি সন্নাস কক্ষ। মধ্যভাগে দেয়াল প্রায় ১৭ ফুট উঁচু। এই বিহারে প্রায় ৬ টি নির্মাণ যুগের প্রমান পাওয়া যায়। এ বিহারে বৌদ্ধভিক্ষুরা বাস করতেন, লেখাপড়া ও ধর্ম চর্চা করতেন।

আনন্দ বিহারঃ- চন্দ্রবংশীর রাজা ভবদেব এই বিহারট প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সময় বিহারটি এশিয়ার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিগণিত হয়। সেই সময় একে বিশ^বিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়। তার প্রমাণ হলো, বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং আনন্দ বিহারে আসেন এবং তিনি এখানে প্রায় ৪০০০ ভিক্ষু ও ময়নামতি অঞ্চলে ৩৫টি শিক্ষাকেন্দ্র দেখতে পান। যার কারণে তিনি কুমিল্লাবাসীকে প্রবল শিক্ষানুরাগী বলে আখ্যায়িত করেন। প্রত্নতাত্তি¦কদের মতে ভারতের নালন্দের পর এশিয়ার দি¦তীয় বৃহত্তম শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো লালমাই-ময়নামতি অঞ্চল।

কোটলা মুড়াঃ- কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত এই মুড়াটি সপ্তম শতকে নির্মিত একটি নিদর্শন। যা তের শতক পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই মুড়ায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে প্রধান তিনটি বৌদ্ধ স্তূপের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এ স্তূপগুলো বৌদ্ধ ধর্মের ত্রি-রত্ন বুদ্ধ ধর্ম এবং সংঘ-র প্রতীক। এছাড়াও এখানে সাত-আট শতকের দুটি পাথরের মূর্তি, প্রচুর অদগ্ধ সীলমোহর ও নিবেদন স্তূপ পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত।

ইটাখোলা মুড়াঃ– কুমিল্লা বার্ড এর পাশে অবস্থিত ১৩.১ মি. ভিতের উপর অবস্থিত এই বিহারটি প্রাচীনকাল হতে ইটপোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হতো বলে এই বিহারের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। এই বিহারে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে বড় বড় কিছু বৌদ্ধস্তূপ ও বৌদ্ধ মঠের সন্ধান পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, এই বিহারটি ৫টি সাংস্কৃতিক যুগ অতিক্রম করেছে। পূর্ববর্তী তিনটি সাংস্কৃতিক কাল পর্যায়ের নিদর্শনগুলো পরবর্তী কালের ধ¦ংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে।

রূপবান মুড়াঃ– কুমিল্লা বার্ড এর পাশে অবস্থিত এই ঢিবিটি ৯০ এর দশকের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ৩৪.১৪ মি. ২৫ মি. পরিমাপের একটি বিহার ও ২৮.৯৬ মি. ২৮.৯৬ মি. পরিমাপের মন্দিরের ধ¦ংসাবশেষ উন্মেচিত হয়েছে। মন্দরের পূর্ব পাশের প্রকৌষ্ঠ থেকে বেলে পাথরের অভয় মুদ্রার বৃহদাকার ১টি বৌদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়। এর সময়কাল ধরা হয় ৭ম থেকে ১২শ শতাব্দীর।

রানী ময়নামতি প্রাসাদ মন্দিরঃ– এই প্রানকেন্দ্রটি লালমাই-ময়নামতি পাহাড় শ্রেণীর সর্ব উত্তর প্রান্তে বিচ্ছিন্ন একট পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সমতল ভূমি হতে এর উচ্চতা ১৫.২২৪ মি.। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বেীদ্ধ ধর্মীয় ক্রশাকার মন্দির সহ ৪টি নির্মাণ যুগের স্থাপত্য নিদর্শণ উন্মোচিত হয়েছে। এটিকে ৮ম থেকে ১২শতকের প্রত্নকীর্তি বলে ধরা হয়।

চন্ডী মুড়া: লালমাই পাহাড়রে দক্ষিণের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই মন্দিরটি কালের সাক্ষীী হয়ে আছে ১৩শত বছর ধরে। এই মুড়ায় আছে আবার ২টি মন্দির একটি হলো চন্ডী মন্দির ও অন্যটি শিব মন্দির।

কিভাবে যাবেন

কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কি.মি. পশ্চিমে ময়নামতি জাদুঘর অবস্হিত ।  শহর থেকে  অটোরিক্সা ময়নামতি জাদুঘর । ময়নামতি জাদুঘরের দর্শন শেষে দর্শনার্থীরা অটোরিক্সায় লালমাই ময়নামতি গ্রুপ অব মনুমেন্টসগুলো পরিদর্শন করতে পারেন ।


Share with :
Facebook Facebook